
যে কোন পেশা বা বয়সের মানুষ হোক না কেন ভাল সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা মানুষকে সফলতা এনে দেয়। বর্তমান সময়ে মানুষের কাজ মনোযোগ অনেক কম, সেই সাথে হাজার রকম ডিস্ট্রাকশন। এছাড়াও বর্তমানে প্রত্যেক মানুষের অনেক রকম ব্যস্ততা। সার্বিকভাবে সবকিছুকে ম্যানেজ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সব থেকে কার্যকর পদ্ধতি বা হাতিয়ার হলো ভালো সময় ব্যবস্থাপনা।
১। নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির কর
জীবনে কোন কিছু অর্জন করতে চাইলে বা কোন কিছু অর্জনের প্রত্যাশা থাকলে সেই লক্ষ স্থির করে আগালে যে কোন রকম ব্যস্ততার মধ্যেও লক্ষ্য অর্জনের কাজের সময় বের করা সম্ভব। কোন লক্ষ্য পূরণের জন্য স্থির করলে তা আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় যুক্ত হয়। ফলে ঐ লক্ষ্য পূরণের কাজ অন্যান্য কাজের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। তখন জাগতিক ডিসট্রাকশন কে সহজে পাশ কাটানো সম্ভব হয়। তাই নিজের সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
২। দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্প
ক্যারিয়ার, কাজ বা পরিকল্পনা যাই হোক, অবশ্যই তাকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ভাগ করে নিতে হবে। অনেক কিছু বা একসাথে বড় কোন কাজ করা সম্ভব না। অল্প সময়ে বড় কোনো কাজ সম্পূর্ণ হবে না। কাজের অগ্রগতি পরিমাপ করতে সমস্যা হবে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে স্বল্পমেয়াদি কিছু ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করে নিলে সফলবভাবে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
৩। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা
যেকোনো কাজে পরিকল্পনা করার সময় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করলে দিনের যে ভালো সময় বা বেশিরভাগ সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেয়া সম্ভব হবে। দিনের পুরো দিন বা দিনের সব সময় সব কাজের জন্য উপযুক্ত না। সবসময় সব ধরনের কাজের জন্য পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়া সম্ভব নয়। তাই সময় ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সময় বন্টন করলে গুরুত্বপূর্ণ কাজে পর্যাপ্ত সময় দেয়া সম্ভব হবে।
৪। সময়কে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করা
সময়কে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করার জন্য দিনের মোট সময়কে ছোট ছোট ব্লকে বিভক্ত করতে হবে। সময়কে ব্লকে ভাগ করার সুবিধা হলো কাজের জন্য পর্যাপ্ত মনোযোগ সহ উপযুক্ত সময় দেয়া যায়। তাছাড়া বর্তমানে সাধারণত মানুষের মনোযোগ প্রেম অনেক কম তাই দীর্ঘ সময় একটি কাজ নিয়ে না থেকে মাঝে বিরতি দিয়ে ব্লক আকারে কাজ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
৫। সময় পর্যালোচনা করা
সময় ব্যবস্থাপনার শুরুতে আপনি আপনার সময় কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিন। মোট সময় কে ছোট ছোট ব্লকে বিভক্ত করে কাজ করার পর আপনার মূল কাজ নিয়মিত সময় পর্যালোচনা করা। সময় পর্যালোচনার অন্যতম লক্ষ্য হলো যে সময় যে কাজে ব্যয় হচ্ছে তা কতটুকু অর্জিত হচ্ছে আর পরিকল্পনায় কোন ভুল আছে কিনা তা নির্ধারণ করা। সার্বিকভাবে এই পর্যালোচনা তে আমরা আমাদের সময় ব্যবস্থাপনার সমস্যা খুঁজে পাবো। প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করলে সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারব।
৬। কাজের সময়সীমা নির্ধারণ
যেকোনো কাজের জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের একটা সীমা থাকা আবশ্যক। কোন কাজেই অসীম সময় দেয়া উচিত না। কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করা থাকলে ঐ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সকল কাজ শেষ করার একটা তাড়না থাকে। আবার কত সময়ে কতটুকু কাজ শেষ করা উচিত এবং পর্যাপ্ত সময়ে পর্যাপ্ত কাজ সম্পাদন করা হলো কিনা তা বোঝা বা পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়।
৭। প্রতিদিনের কাজের তালিকা তৈরি করা
প্রতি মুহূর্তে আমাদের নানা রকম ব্যস্ততা ও ডিস্ট্রাকশনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাই লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকলেও করতে ভুলে যাওয়া বা অনীহা আসতে পারে। আমার অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকায় গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরি কোন কাজ করার কথা মনে না থাকতে পারে। তাই সময়কে যথাযথ ব্যবহার করার জন্য তালিকা তৈরি করতে হবে। সেই কাজের তালিকা অনুযায়ী প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ সংখ্যক কাজে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।
৮। মাল্টিটাস্কিং না করা
আমরা মনে করি একসাথে একাধিক কাজ করলে আমরা অল্প সময়ে অনেক কিছু করে ফেলবো। বাস্তবে ঘটে এর উল্টো। আমরা একসাথে একাধিক কাজ করতে গেলে অনেক ঝামেলায় পড়ি আর সময় অপচয় হয়। মাল্টি টাস্কিং যেভাবে আমাদের ক্ষতি করে একসাথে একাধিক কাজ করায় আমাদের প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। এই কারণে এভাবে কাজ করায় কাজে ফোকাস কম থাকে। মাল্টিটাস্কিং এর ফলে কাজের গুনগত মান কমে যায়। কারণ একাধিক কাজে মনোযোগ রাখায় কাযে ভুল হয়। একটি নির্দিষ্ট কাজে অনেক সময় লেগে যাওয়ায় মানসিক চাপ বেড়ে যায় ফলে ঐ কাজে আগ্রহ হারিয়ে যাই। অনেকে আগ্রহ হারিয়ে মাছ পথে কাজ থামিয়ে দেয় এর ফলে অনেক সময় অপচয় হয়।
৯। প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমানে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া আমাদের একটি দিনও কল্পনা করতে পারব না। প্রযুক্তি পণ্য ও সেবা আমাদের অনেক সময় কেড়ে নেয়। আমরা চাইলে সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রযুক্তি পণ্য ও সেবার সাহায্য নিতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ কাজের ডেডলাইন সহ বিস্তারিত গুগোল ক্যালেন্ডারে যুক্ত করতে পারি। প্রতিদিনের কাজ করার জন্য টুডু-লিস্ট এপ ব্যবহার করে প্রতিদিনের কাজগুলো তালিকা করে, পরে কাজ শেষ করে টিক মার্ক করে নিতে পারি। তাহলে কতগুলো কাজ করা হলো আর কতগুলো কাজ বাকি তা জানতে পারবো।
১০। না বলতে শেখা
একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে আমাদের অনেকটা সময় চলে যায় এই কাজগুলো আমরা করতে চাই না। কিন্তু অন্য কেউ অনুরোধ জানিয়েছে বা কেউ বলেছে তাই করছি। ব্যক্তি জীবনে না বলতে পারা এবং উপযুক্ত জায়গায় বা সময়ে না বলতে পারা একটা বড় গুণ। যথাযথ অপ্রয়োজনে না বলতে পারলে অনেক সময় অপচয় হওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব। তাই অপ্রয়োজনীয় কোন কাজের অনুরোধে না বলতে হবে।
সর্বোপরি সময় ব্যবস্থাপনা একটি অভ্যাসগত ব্যাপার। একদিনে সময় ব্যবস্থাপনা করা বা শেখা সম্ভব না। সময় ব্যবস্থাপনা বা সময়কে যথা ভাবে কাজের ব্যবহার করার ইচ্ছা থাকলে সেই অনুযায়ী নিয়মিত কাজে ও অভ্যাসে তা প্রতিফলিত করতে হবে। গুরুত্বের ভিত্তিতে ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে গেলে সময় ব্যবস্থাপনা অনেক আংশিক হয়ে যায়।